আম্ফান-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে

অতি-ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ এই রাজ্যের কৃষি, পশুপালন ও বনভূমিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। যতটা ভাবতে পারছেন, তার চাইতেও বেশি। করোনা পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্য বেচে খাওয়ার সম্বলটুকু হারিয়ে ফেলেছে বাঙ্গলার কৃষক। মাঠে শেষ হয়ে গেছে ধান, পাট, ভুট্টা, গ্রীষ্মকালীন সব্জি ও ফলের গাছ। উপকূলবর্তী এলাকায় ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের ক্ষয়ক্ষতি অভূতপূর্ব; সমাজভিত্তিক বনভূমি তছনছ হয়েছে; পথিপার্শ্বস্থ বৃক্ষ বহু সংখ্যায় উৎপাটিত হয়েছে — এমনই জানতে পারছি টুকরো টুকরো খবরে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে। পুরো খবর আসা এখনও বাকী। গবাদিপশু, পুকুর ও জলাশয়ের মাছচাষ লণ্ডভণ্ড। প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা যে আমাদের আতঙ্কিত করে তুলবে, তা বলাই বাহুল্য। নেট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন মানুষ, খাদ্য ও পানীয়জলের হাহাকার। মানুষের বসবাসের আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে সুপার সাইক্লোন। 
 
গাছপালার যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিশেষত বনজঙ্গল, বাদাবন, সমাজভিত্তিক বন, ফলবাগিচা এবং পথিপার্শ্বস্থ বৃক্ষের — তার পরিবর্ত উদ্ভিদ লাগানোর পরিকল্পনা এখনই করতে হবে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলিকে। কৃষিবিভাগ, উদ্যানপালন বিভাগ, বনবিভাগ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নার্সারী রচনার মাধ্যমে প্রতিবারের চাইতে অত্যন্ত দশগুণ গাছের চারা তৈরি করার উদ্যোগ নিক। কোন কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে, তারও একটি নির্দেশিকা জারি করুক। সমাজভিত্তিক বন ও পথিপার্শ্বস্থ উদ্ভিদ হিসাবে রকমারি ফলের গাছ যতটা সম্ভব লাগানো হোক। সমস্ত নদীপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত খালের ধারে ধারে স্থানীয় এনজিও-কে গাছ লাগানোর কাজে উদ্বুদ্ধ করা হোক। পঞ্চায়েতগুলি নিজস্ব আর্থিক পরিকল্পনায় নার্সারী তৈরি করে চারা লাগিয়ে দিকে নিজের অঞ্চলে। চারা বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নিক স্থানীয় মানুষের উপর দায়িত্ব দিয়ে। ১০০ দিনের কাজে যথাসম্ভব পুকুর কেটে বর্ষার জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করুক, বনজ উদ্ভিদের বীজ ও চারা কুড়িয়ে নার্সারীতে যত্ন করুক এবং তা যথাযোগ্য স্থানে রোপন করুক। ১০০ দিনের কাজে কোথাও যেন পরিকল্পনার অভাব না থাকে। এই বছরটা কিন্তু উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর, এর উপরেই নির্ভর করবে আগামী দিনে রাজ্যের পরিবেশ কেমন হবে, উষ্ণায়নের প্রভাব কমানো যাবে কিনা, সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ গাছ ব্যাপকভাবে লাগিয়ে আগামী ঝড়-ঝঞ্ঝা আটকানো যাবে কিনা, নদী-খাল-খাঁড়ির ধারে বৃহৎ গাছ লাগিয়ে ভূমিক্ষয় ও নদীভাঙ্গন রোধ করা যাবে কিনা এবং বনজ সম্পদ বাড়িয়ে রাজ্যের গরীব মানুষের রুটিরুজির বন্দোবস্ত করা যাবে কিনা।
কৃষিবিজ্ঞানের অধ্যাপক, গবেষক, ছাত্র, কৃষিকর্মী, পরিবেশবিদ, নদীবিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানকর্মী, সমাজসেবী সকল মানুষের কাছে আহ্বান — আপনারা এখনই পরিকল্পনা নিন কত বেশি সংখ্যায় নার্সারী বানানোর কাজ করে চারা তৈরি করা সম্ভব। তা রোপণ করে, বাঁচিয়ে বড় করা অবধি সকলের সঙ্গবদ্ধ প্রয়াস জারি থাকুক। আমের মরশুমে সমস্ত আমের আঁটি কুড়িয়ে তা কেয়ারিতে যত্ন করে রাখুন, চারাকুশলীকে ডেকে কয়েকমাসের কচি চারার উপর ভালো জাতের পরশাখীর ডাল জুড়ে জোড়কলমের চারা তৈরি করুন। নিমের বীজ, বাবলা গাছের বীজ, জারুল গাছের বীজ, নানান বনজ গাছের বীজ সংগ্রহ করার কাজ করান স্বেচ্ছাসেবীদের। স্বয়ংসেবক বন্ধুরা চারা তৈরির কলাকৌশল শিখে নিন। কৃষিজীবী মানুষেরা নিজের জমিতে কৃষিবন রচনা করুন। ঘন করে বিশেষ মডেলে ফলবাগিচা নির্মাণ করে প্রকৃতি বাঁচান এবং অধিক আয় ঘরে তুলুন।
 
২১ মে, ২০২০; *ড. কল্যাণ চক্রবর্তী* -র প্রতিবেদন। 

Leave a comment